
বিবাগী
পালোনো
শহরের এক কোণে, পুরনো দোতলা বাড়ির ভেতরে থাকতেন অনিরুদ্ধ। পেশায় সংগীতশিক্ষক—কণ্ঠসঙ্গীত, ধ্রুপদী, ঠুমরি—সবেতেই তাঁর দখল। মানুষটা খুব সুন্দর ছিলেন না, কিন্তু তাঁর মধ্যে একটা দৃঢ়, পুরুষালী ব্যক্তিত্ব ছিল, আর ছিল অদ্ভুত শান্ত একটা গাম্ভীর্য। গান গাইতে শুরু করলে যেন চারপাশ থমকে যেত।
তাঁর স্ত্রী মাধুরী—নামের মতোই মাধুর্যময়। অপূর্ব সুন্দরী, তার চেয়েও বেশি মিষ্টি ব্যবহার। পাড়ার সবাই তাকে ভালোবাসত। কারো অসুখ হলে সে ছুটে যেত, কারো মেয়ের বিয়ে হলে সে আগে গিয়ে সাহায্য করত। এমন মেয়ে যেন ঘরে ঘরে জন্মায়—এই কামনাই করত সবাই।
কিন্তু এই মাধুরীর মধ্যেই ছিল এক অদ্ভুত দহন—ভালোবাসার এক অতি-তীব্র, দমবন্ধ করা রূপ।
প্রথম প্রথম অনিরুদ্ধ বিষয়টা গুরুত্ব দেননি। ভেবেছিলেন, নতুন বিয়ে, একটু আঁকড়ে থাকার ইচ্ছে থাকেই। কিন্তু ধীরে ধীরে বিষয়টা অন্য দিকে মোড় নিল।
কোন তরুণী ছাত্রী এলে মাধুরী পাশে বসে থাকত।
ছাত্রী যদি একটু হাসত, সে চোখ কুঁচকে তাকাত।
ছাত্রীর মা বা দিদি এসে কথা বললে, সে কথার ভেতর দিয়ে এমন কাঁটা ফুটিয়ে দিত—যাতে মানুষটা অপমানিত না হয়ে পারে না।
“আপনারা খুব ভরসা করেন বুঝি?”
বা
“এই বয়সে গান শেখা বড় দরকার?”
বা
“মেয়ে তো খুব বেশী মাত্রায় আগ্রহী দেখছি... শুধু গানেই না অন্য কিছুতেও আগ্রহ আছে? ”
কথাগুলো বাইরে থেকে সাধারণ, কিন্তু ভেতরে বিষ মাখানো। বাইরের কেউ শুনলে বোঝেনা কিন্তু যাকে বলা হয় তার মর্মে বেঁধে আর বোঝেনা অনিরুদ্ধ। অনিরুদ্ধ প্রথমে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন
“মাধুরী, এভাবে চললে আমার কাজটাই থাকবে না।”
মাধুরী তখন কেঁদে ভাসায়, “তুমি আমাকে ভালোবাসো না... তাই আমি ভয় পাই…”
কঠিন কথা বললেই সে ভেঙে পড়ত, ঠাকুরঘরে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রার্থনা করত, “ওকে আমার থেকে কেড়ে নিও না…”
এই কান্না, এই আতঙ্ক, এই অযৌক্তিক ভয়—সব মিলিয়ে অনিরুদ্ধের জীবনটা ধীরে ধীরে এক অদৃশ্য কারাগারে পরিণত হল। রাগ করতে পারেন না কঠিন কথা বলতে পারেন না।
এক সময় তিনি মেয়েদের টিউশন নেওয়াই বন্ধ করে দিলেন।শুধু ছেলেদের শেখাতে লাগলেন।
কিন্তু তাতেও মুক্তি নেই।
ছাত্রের মা যদি একদিন দরজায় এসে দাঁড়ায়, মাধুরী দূর থেকে সব লক্ষ করে।
কোনো বউদি এসে যদি কথা বলে, সে হঠাৎ সামনে এসে বসে পড়ে।
তারপর এমনভাবে কথার জাল বোনে বা তাকায়, যে সামনের মানুষগুলো অস্বস্তি বোধ করতে থাকে।
অনিরুদ্ধ তখন চুপ করে থাকেন।প্রতিবাদ করার শক্তিটুকুও যেন ফুরিয়ে গেছে।ধীরে ধীরে তাঁর গান কমে যায়।কণ্ঠে ক্লান্তি জমে।চোখের নিচে কালি পড়ে।
কেউ কিছু বুঝতে পারে না।
সবাই শুধু দেখে—একজন স্ত্রী, যে স্বামীকে ভীষণ ভালোবাসে।বছর কেটে যায়।যৌবন ফুরোয়।
একদিন হঠাৎ—মাধুরী বুকের ব্যথায় অজ্ঞান হয়ে গেল।আগে কখনো কিন্তু এমন হয়নি। বরং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই সব শেষ।
হৃদয় কেমন ছিল তা অনিরুদ্ধ জানতেন কিন্তু হৃদযন্ত্রের অবস্থা যে এত খারাপ হয়েছিল কবে, তা জানতে পারেননি। দীর্ঘ সময়কালে খুব বেশি অসুখভিষুকও তো করেনি।
শ্মশানের আগুন যখন নিভে এল, অনিরুদ্ধ তখনও যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না—এটা সত্যি।
মাধুরী নেই।এই “নেই” শব্দটা তাঁর ভেতরে ঢুকছিল না।
প্রথম রাতটা কেটে গেল নির্বাক।
দ্বিতীয় দিন, লোকজনের ভিড়, কান্না, সান্ত্বনা—সব মিলিয়ে একটা অস্পষ্ট ঘোর।
তৃতীয় দিন সকালে, হঠাৎ তিনি একা বসে ছিলেন বারান্দায় চারপাশে কেউ নেই। সেই প্রথম—তিনি অনুভব করলেন এক অদ্ভুত, নিষিদ্ধ অনুভূতি। হালকা লাগছে। ভালো লাগছে।
একটা অচেনা, অপরাধবোধে মোড়া মুক্তি।
তিনি চমকে উঠলেন নিজের মধ্যেই—
“আমি কি তবে ওর মৃত্যু চেয়েছিলাম?”
না।
কখনোই না।
কিন্তু এই যে বুকের ভেতর থেকে একটা চাপ সরে গেছে!
এই অনুভূতিটা অস্বীকার করবেন কীভাবে?
এরপর শুরু হল অন্য যন্ত্রণা।
লোকজন আসছে, বলছে, “তোমার মতো ভালোবাসা কজনের কপালে জোটে!”
“ও তোমায় কতটা ভালোবাসত!” তুমি ভাগ্যবান।
কেউ কেঁদে বলছে “তোমার তো সব শেষ হয়ে গেল…”
সবাই তার শোক দেখছে।কেউ তার মুক্তিটা দেখছে না।
আর সেই মুক্তিটাই যেন এখন তার কাছে সবচেয়ে বড় অপরাধ।মাধুরীর জন্য অনির্বাণের বোনেরা এসে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে—“দাদা, তুমি একা হয়ে গেলে…”
অনিরুদ্ধ চুপ করে থাকেন। তারা ভাবে শোকে দাদা স্তব্ধ পাথর হয়ে গেছে। তিনি জানেন—তিনি একা হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু এই একাকীত্বের মধ্যে এক শান্তি আছে। আর সেই শান্তির জন্যই তিনি লজ্জিত।
শ্রাদ্ধের তিনদিন পর সকালে, পাড়ার লোকজন দেখে—
বাড়িতে তালা।
কেউ জানে না কখন তিনি বেরিয়েছেন।
শুধু একজন বলল—ভোরে নাকি তাকে দেখা গেছে।
কাঁধে একটা পুরনো ঝোলা, হাতে তানপুরা। ধীরে ধীরে হাঁটছিলেন।
কেউ ভেবেছে—শোকে পাগল হয়ে গেছেন।
কেউ বলেছে—প্রেমে বিবাগী।
কিন্তু আসলে—অনিরুদ্ধ পালিয়েছেন। শোক থেকে নয়,
ভালোবাসা থেকেও নয়—মানুষের সহানুভূতির অত্যাচার থেকে।
অনেক দূরে, এক নির্জন নদীর ধারে বসে তিনি আবার গান ধরলেন। কণ্ঠ কাঁপছিল। কিন্তু বহুদিন পর—সুরটা নিখুঁত ছিল।কারণ তিনি কারো জন্য নয়,
নিজের জন্য গান গাইছিলেন।
মাধুরীর কথা
মাধুরী ছোটবেলা থেকেই সুন্দরী।
এমন সুন্দরী, যে যেখানে যেত, লোকের চোখ আটকে যেত।তার রূপ সম্পর্কে তাই তার অবচেতনে একটা অহংকার ছিল। তার রূপকে কেউ অস্বীকার করতে পারে না। তাকে যে ভালবাসবে শুধু তাকেই ভালবাসবে অন্য কারো কাছে আর কখনো যেতে পারবে না তার রূপের সেই চৌম্বক শক্তি আছে।
কিন্তু সেই চোখগুলোর ভেতরে অনেক রকম অভিব্যক্তি ছিল
শুধু কৌতূহল, লোভ, কখনো হিংসে, কখনো দখলদারির চেষ্টা।
স্কুলে পড়ার সময় এক শিক্ষক তাকে একটু বেশিই আগ্রহ নিয়ে দেখতেন। সেই শিক্ষকের কাছে সেই ছিল স্কুলের সেরা ছাত্রী। তারপর যখন একটু ক্লাসে উঠলো তখন বাইরে থেকে আর একজন দিদি এসে তাদের ক্লাসে ভর্তি হল তার বাবা ট্রান্সফার নিয়ে এখানে এসেছে সেও খুব সুন্দরী তার থেকেও বড় খুব হাসি খুশি সহজ সরল। মাধুরী যেমন খুব যেচে মিশতে পারেনা, সে তেমন নয়। স্যার তাকে দেখে বলেছিলেন উচ্ছল ঝরনার মত। একদিন সে অনুভব করলো এখন আর সে স্যারের একমাত্র প্রিয় ছাত্রী নেই। সেই নবাগত স্যারের ততটাই প্রিয় খুব অবাক হয়েছিল! খুব আশ্চর্য হয়েছিল!
পাড়ার একটা ছেলে “ভালোবাসি” বলে পিছু নিত, মাধুরী কখনো পাত্তা দেয়নি। সে নিজে রূপের গরিমাকে খুব ভালো করে উপভোগ করতো কিন্তু তা বলে যার তার সাথে মিশতো না। অনেকে বলে সুন্দরী মেয়েরা ছেলেদের নাচিয়ে বেড়ায় তা কিন্তু ছিল না সে। মাধুরী ভক্তদের দৃষ্টির আরতিকে পছন্দ করত কিন্তু নিজে কখনো জড়াতো না। একদিন অন্ধকারে কোচিং থেকে ফেরার পথে সেই প্রেমিক তাকে জোর করে জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়েছিল। মাধুরী এত অবাক হয়েছিল, এত দুঃখ পেয়েছিল ছিটকে সরে এসেছিল। এর নাম কি ভালোবাসা ? এত খারাপ হয় মানুষ? এসব নোংরামী করার জন্য কি তাকে ভালোবাসার কথা বলেছিল। ছি ছি ছি ছি ছি!
স্কুল লাইফের শেষের দিকে তার এক বন্ধুর প্রেমিক যে নাকি বন্ধুকে পাগলের মতো ভালোবাসতো সেই তাকে ছেড়ে অন্য একটি মেয়ে প্রেমে পড়ে গেল। বন্ধুর সাথে আর কোন সম্পর্ক রইল না। ধীরে ধীরে মাধুরী মনে হচ্ছিল ছেলেরা বড় ভোগী , তাদের মন বলে কিছু নেই। সেই বান্ধবী তার কাছে খুব কাঁদত।
পরে যখন বড় হল তখন আর একটা আঘাত পেল। এক বান্ধবী অনেক ছোট বয়সে বিয়ে হয়েছিল ধুমধাম করে বিয়ে হয়েছিল। তারা নিমন্ত্রণ খেতে গিয়েছিল খুব ভালো লেগেছিল দুজনের ভালোবাসার গল্প শুনে। তারপর মাঝে আর দেখা সাক্ষাৎ হয়নি। এখন আর এক বান্ধবীর মুখে শুনল সেই বান্ধবীর বিয়ে ভেঙে গিয়েছে কারণ বিয়ের পাঁচ বছর পর তার স্বামী অন্য কারো সাথে জড়িয়ে পড়েছিল।
মাধুরীর মনে একটা জিনিস ধীরে ধীরে পাথরের মতো বসে গিয়েছিল—“পুরুষ মানেই একদিন চলে যাবে।”
তারপর অনিরুদ্ধ এল জীবনে। অদ্ভুত মানুষ।
চোখে লোভ নেই, কথায় বাড়াবাড়ি নেই।প্রথমদিনই মাধুরী বুঝেছিল—এই মানুষটা অন্যরকম।
আর সেই “অন্যরকম” জিনিসটাই তাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল।
বিয়ের পর প্রথম কয়েক মাস—সব স্বাভাবিক। তারপর একদিন, এক ছাত্রী গান শিখতে এসে অনিরুদ্ধের দিকে তাকিয়ে হেসেছিল। খুব সাধারণ একটা হাসি।
কিন্তু মাধুরীর বুকের ভেতর যেন কিছু ভেঙে গেল।
সেই হাসির মধ্যে সে দেখতে পেল, হারানোর শুরু।
সেদিন রাতেই সে অনিরুদ্ধকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেছিল, “তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে না তো?”
অনিরুদ্ধ হেসে বলেছিল, “পাগল নাকি?”
কিন্তু মাধুরীর ভয়টা থামেনি। কারণ ভয়টা অনিরুদ্ধকে নিয়ে নয়, ভয়টা ছিল নিজেকে নিয়ে।সে জানত তার সৌন্দর্য একদিন ফুরোবে। তার বয়স বাড়বে।
একদিন হয়তো কেউ তার চেয়ে সুন্দর আসবে।
আর তখন?এরপর শুরু হল তার যুদ্ধ।
সে অনিরুদ্ধকে বাঁধতে চাইছিল, কিন্তু আসলে সে লড়ছিল নিজের ভিতরের আতঙ্কের সাথে।
ছাত্রী এলে সে পাশে বসে থাকত—
কারণ সে দেখতে চাইত, কেউ অনিরুদ্ধকে কেড়ে নিচ্ছে কি না। কোনো নারী কথা বললে সে কথার ভেতরে বিষ ঢুকিয়ে দিত— কারণ সে আগে আঘাত করতে চাইত।
অনিরুদ্ধ যখন বিরক্ত হতো, সে ভেঙে পড়ত।
কারণ তার কাছে অনিরুদ্ধের রাগ মানেই... “সে দূরে সরে যাচ্ছে।”
ঠাকুরঘরে বসে সে প্রার্থনা করত—
“ওকে শুধু আমার রেখো…আমার থেকে দূরে যেন না যায় কখনো। "
তার প্রার্থনা কখনো অনিরুদ্ধকে বেঁধে রাখার জন্য ছিল না—বরং নিজের ভয়কে চেপে রাখার জন্য।
সে জানত না,তার ভালোবাসা ধীরে ধীরে অনিরুদ্ধকে শ্বাসরোধ করছে।সে শুধু দেখত, অনিরুদ্ধ চুপ হয়ে যাচ্ছে।আর সেই চুপ হয়ে যাওয়া দেখে সে আরও ভয় পেত।আরও আঁকড়ে ধরত। আরও সন্দেহ করত।
একদিন আয়নায় নিজের মুখ দেখে সে চমকে উঠেছিল।চোখের কোণে ভাঁজ পড়েছে কি ।
সেদিন সে অনেকক্ষণ ধরে নিজের মুখে হাত বুলিয়ে বলেছিল—“এবার তো ও চলে যাবে…”
শেষের দিকে তার শরীর ভেঙে যাচ্ছিল।
হৃদযন্ত্রে সমস্যা হচ্ছিল।
কিন্তু সে কাউকে বলেনি।
কারণ তার মনে হয়েছিল—আমি দুর্বল হলে ও আরও দূরে চলে যাবে।
মৃত্যুর আগের রাতে, সে চুপচাপ অনিরুদ্ধকে দেখছিল।
অনিরুদ্ধ ঘুমোচ্ছিল।
মাধুরী ধীরে ধীরে তার হাতটা ছুঁয়ে বলেছিল, “আমি না থাকলে তুমি ভালো থাকবে… তাই না?”
অনিরুদ্ধ কিছু না বলে ক্লান্ত চোখে শুধু তাকিয়ে ছিল তার দিকে। এই প্রথম—সে নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই পেয়ে গিয়েছিল। পরের দিন, সব শেষ।
সবাই বলল— মাধুরী স্বামীকে ভীষণ ভালোবাসত।
কেউ বলল না—সে ভীষণ ভয় পেত।
আর অনেক দূরে কোথাও, অনিরুদ্ধ যখন প্রথমবার নিজের পাহাড় প্রমাণ ভার মুক্তি বোধ করল, হালকা লাগা অনুভব করল—মাধুরীর অদৃশ্য একটা অংশ যেন ফিসফিস করে বলল, “দেখো, আমি ঠিকই বলেছিলাম…..
আমাকে ছাড়া তুমি ভালো আছো…”
